।। কে জি মোস্তফা ।। অধিকাংশ মানুষই তো নিজস্ব পরিমণ্ডল আর কাছাকাছি বর্তমান নিয়ে বেঁচে থাকে। আমিও প্রতিদিন দুপুর ১২টা নাগাদ প্রেস ক্লাব যাই, যেতে হয়। পৌঁছেই প্রথম কাজ বন্ধুদের সাথে এক পেয়ালা চা পান। চায়ের আড্ডা। চলছে তো চলছেই। এ যেন এক নন্দন কানন। কেউ আসে কেউ যায় সবাই আপন।
সবাই সবার কাছাকাছি, স্নেহে ভালোবাসায় জড়ানো। না দেখিলে প্রাণ করে যেন আনচান। অনন্তকাল এ আড্ডা বুঝি চলতেই থাকবে, চলুক। কেউ তো এমন হালকাভাবে জন্মগ্রহণ করেনি আনন্দের সাথে যে এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে পারে। কিন্তু ক্লাব-সদস্যদের কেউ, কিংবা আমার কোনো প্রিয়জন, অথবা কোনো চেনামানুষের অকস্মাৎ মৃত্যুবরণ আমাকে দাঁড় করিয়ে দেয় এক বিপন্নতার মুখে।
আমাদের স্মৃতিশক্তি অল্প, খুব স্পষ্ট করে সব কিছু মনে রাখতে পারি না। কাউকে হারানোর দুঃখে দীর্ঘ শোক করার ক্ষমতা নেই। দুর্বল স্মৃতি দ্রুত সব ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু পৃথিবীতে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, রোজ মানুষ মারা যাচ্ছে, তবু লোকে ভাবে সে অমর। অথচ জন্মগ্রহণ করেছে এমন জীব মাত্রেরই মৃত্যু অবধারিত।
প্রসঙ্গত মনে পড়ল বিস্মৃত এক সাংবাদিক ও কবি হাসান আবদুল গোফরানের কথা।
হাসান আবদুল গোফরান সম্পর্কে আমার মামা। বয়সে যদিও আমার দুই বছরের ছোট। আমরা পরস্পরকে নাম ধরে ডাকতাম। জীবনভর তার সাথে মায়াময় এক আলগা স্নেহে আবদ্ধ ছিলাম। ফেলে আসা ধূসর অতীত ফিরিয়ে আনে সকরুণ স্মৃতি। জীবনে আমার যতবার কর্মান্তর ঘটেছে, সেই দুঃসময়ে হাসান গোফরান ছিল একমাত্র আশ্রয়স্থল।
সুদর্শন সুমার্জিত রুচির মানুষ হাসান গোফরান যেমন ছিলেন বন্ধুবৎসল, তেমনি সত্যবাদী ও ন্যায়নিষ্ঠ।
স্বমহিমান্বিত সাংবাদিকতায় তৎকালীন ‘দৈনিক আজাদে’ সহ-সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। আজাদের এককালের নিউজ-এডিটর বিশিষ্ট কবি আবদুর রশীদ ওয়াসেকপুরীর সাথে ছিল তার ঘনিষ্ঠতা। ছিলেন তার ভাবশিষ্য।
গোফরানও একসময় তার মতো সংসারবিবাগী হয়ে দীর্ঘকাল বিভিন্ন মাজার শরিফ ঘুরে বেড়াতেন।
সুহৃদ সহকর্মীদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় একসময় গোফরান সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। যোগ দেন দৈনিক ইনকিলাবের মফস্বল বিভাগের সম্পাদক হিসেবে। দীর্ঘ দিন কর্মরত ছিলেন সেখানে। একসময় চাকরিচ্যুত হয়ে দেশের বাড়ি চলে যান। সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারের সন্তান হাসান গোফরান। পৈতৃক সম্পত্তির জমিজমা বিক্রি করে দিন যাপন করতেন।
মামা-ভাগ্নে আমরা দু’জনেই ছিলাম সমমনস্ক। জীবনের দিকে, সমাজের দিকে, সাহিত্যের দিকে, দু’জনের ভাবনা ছিল একইরকম। কবিতা লেখা ছিল তার অন্তঃশীল অঞ্চল। পঞ্চাশ-ষাট দশকে এ দেশের কাব্যাঙ্গনে ছড়াকার ও সনেটকার হিসেবে হাসান আবদুল গোফরান এক সুপরিচিত নাম। তৎকালীন দৈনিক পত্রিকা ও সাময়িকীগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হতো তার কবিতা। পাঠকের মনে সেগুলো যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করত।
নোয়াখালী বেগমগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বজরা রেলস্টেশন সংলগ্ন হাসান গোফরানের পৈতৃক বাড়ি। উপ-মহাদেশের ইতিহাস খ্যাত জৈনপুরীর পীর মওলানা কেরামত আলী সাহেবের পুত্র পীর আবদুল হামিদ সাহেবের মাজার ওই এলাকারই ‘ছনুয়া’ গ্রামে। সেখানে ভক্তদের ভিড় আজও অব্যাহত। এখনো রয়েছে সেই প্রাচীন সুবিশাল বাড়ি। এটা তৎকালীন পাকিস্তান পর্লামেন্টের স্পিকার মৌলবী তমিজউদ্দীন খানের শ্বশুরালয়।
সে যাই হোক, হাসান আবদুল গোফরান অধিক বয়সে বিয়ে করেন। কিন্তু দাম্পত্যে অবনতি ঘটায় নিজ পরিবার থেকে ছিলেন বিচ্ছিন্ন। তাদের একটিমাত্র কন্যা সন্তান। সুদর্শনা ও মেধাবী। দীর্ঘ দিন ছিল অ-সাক্ষাৎ। বছর তিনেক আগে হয়তোবা নাড়ির টানে মেয়েকে দেখার জন্য ঢাকায় আসেন। হঠাৎ স্ট্রোক হয়ে সেদিনই ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। জীবনটাই ছিল তার বোবা যন্ত্রণার ইতিহাস।
ভাগ্য অথবা নিয়তি অথবা সময়- যার ওপর ছড়ি ঘোরানোর অধিকার নিয়ে কোনো মানুষই জন্মায়নি। তবু সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ মানুষের জীবনে কী অসম্ভব প্রবল! সে কথা একাধিকবার ঘুরেফিরে অনুভব করি। সেই সাথে বুঝতেও পারছি, এই অনুভবের কোনো আদি-অন্ত নেই। সত্যের মতো প্রতিবারই কোনো না কোনো মৃত্যু আমাকে এই অনুভবের কাছে নিয়ে আসে। দিনকয়েক মন খারাপ থাকে, অতঃপর টেনে নিয়ে যায় জীবনের মূলস্রোতে। যেখানে ঝাঁপ দেওয়ার পর আবার বিশ্বাস করতে থাকি, এই যে বেঁচে আছি।
মরমী দর্শনে কিন্তু মৃত্যু মানেই চেতনার বিলুপ্তি নয়। ব্যক্তি চেতনার মৃত্যু হলেও সার্বিক চেতনার মৃত্যু হয় না। কারণ চেতনার সাথে জড়িয়ে আছে অনন্তের স্পর্শ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
এই অনন্তরই প্রতিরূপ সার্বিক চেতনা। মৃত্যু তো সার্বিক বিষয় নয়। ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যু ঘটলেও সমগ্র মানবজাতির মৃত্যু হয় না। মৃত্যু তো অনন্ত জীবনপ্রবাহের গতিকে রুদ্ধ করতে পারে না। এ এক আশ্চর্য গতিময়তা, যা বিশ্বের প্রাণপ্রবাহকে এক মহামন্ত্রে দীক্ষিত করে রেখেছে।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সত্য-সুন্দর বাস্তবকে আস্বাদনের জন্যে সর্বদাই মানবসত্তার প্রাণপ্রবাহ বিরাজমান। মৃত্যু তো খণ্ড থেকে পূর্ণ, সীমা থেকে অসীম, অন্ত থেকে অনন্তের দিকে এক মানসযাত্রা। জয়তু অনন্ত জীবন, জয়তু চিরজীবী মানবাত্মা!